নিজস্ব প্রতিবেদক:
যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের পাশে একটি এতিমখানা প্রাঙ্গন ঘিরে চলছে ইফতারির আয়োজন। আর এ ইফতারিতে অংশ নিতে এসেছেন ভিক্ষুক থেকে শুরু করে দিনমজুর, রিকশাচালক, পথচারীসহ নানা শ্রেনী পেশার মানুষ। আছে এতিম শিশু ও প্রতিবেশীরাও। চোখ জুড়ানো এমন দৃশ্য শার্শা উপজেলার শ্যামলাগাছি হযরত শাহজালাল (রহঃ) লতিফিয়া মডেল মাদ্রাসা ও এতিমখানায়। এখানে পুরো রমজান মাস জুড়ে উন্মুক্তভাবে বিনামূল্যে ফ্রি ইফতার ও সেহরির আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিদিন এখানে ইফতার করতে আসেন প্রায় দেড়শ থেকে দুইশ’ রোজাদার। আর এ ব্যাতিক্রমী মানবিক উদ্যােগ গ্রহন করেছেন মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা মোটর মেকানিক উদ্ভাবক মিজানুর রহমান।
মোটর মেকানিক মিজান নিজে ইফতারের সকল আয়োজনে সাহায্য করেন। তার সাথে সহোযোগিতা করেন তার মাদ্রাসার ছাত্ররাও। তার এতিমখানায় উন্মুক্ত ইফতারিতে অংশ নিতে আসা সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে ইফতারির আসরে বসান, এরপর দোয়া মোনাজাত শুরু হয় এবং ইফতার সামগ্রী তাদের সামনে সাজিয়ে দেন। প্রতিদিনই সেখানে এক ভিন্ন দৃশ্য উপস্থাপিত হয়—নানা বয়সী শিশুরা, পথচারী মানুষরা, এমনকি দরিদ্র ও ভিক্ষুকরাও এসে ভিড় করেন ইফতারির জন্য। আবার অনেকে ভোরে আসেন সেহরিও করতে।
এমন ব্যাতিক্রমী আয়োজনের উদ্যােক্তা মিজানুর রহমান জানান, বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূলের উর্ধগতিতেও থেকে থাকেনি তার এ মাস ব্যাপি বিনামূল্যে ইফতার ও সেহরির আয়োজন। মিজানুরের খুব বেশি আর্থিক সঙ্গতি না থাকলেও সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও আর্থিক সহযোগিতায় কোন রকম ভাবে চলছে মাসব্যাপী ইফতার ও সেহরির আয়োজন। ইফতারিতে থাকছে, ছোলা, মুড়ি, খেজুর, পিয়াজু, বেগুনী, আলুর চপ, তরমুজ, আপেল, আঙুর, সরবত, বিরিয়ানিসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার। একেকদিন একেক রকম খাবারের আয়োজন করা হয় ইফতার ও সেহরিতে।
মিজানুর রহমান বলেন “রমজান মাস মানে শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যদের জন্যও কিছু করা। আমাদের যতটুকু সামর্থ্য আছে, ততটুকু দিয়ে অসহায়দের সাহায্য করতে পারলেই তো শান্তি পাওয়া যায়। আমি শুধু চাই, আমার এই উদ্যোগ যেন অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করে।”
তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর এমন আয়োজন করে থাকি। তবে এ বছর আর্থিক সংকটের কারণে মাসব্যাপী ইফতার আয়োজন করা নিয়ে সংশয়ে ছিলাম। তবে আল্লাহর অশেষ দয়ায় ইফতার আয়োজন করতে সক্ষম হয়েছি। প্রতিদিন ইফতার ও সেহরির আয়োজনে প্রায় সাত থেকে আট হাজার টাকা ব্যায় হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর আগে ফ্রি খাবার বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, সেটি চলমান, একটি ফ্রি এতিমখানা মাদ্রাসা করেছি, একটি মডেল মসজিদের কাজ চলছে। সবকিছু করতে করতে নিজের সম্বল বলতে কিছুই নেই। এখন কিছু মানবিক মানুষ সহোযোগিতা করে আর নিজের ওয়ার্কশপের আয় থেকে এ কার্যক্রম চলছে।’
ইফতারিতে অংশ নিতে আসা মেজবাউর রহমান নামে এক ইজিবাইক চালক বলেন, ‘প্রতিদিন রোজা রেখে এই সড়কে ইজিবাইক চালাই। ইফতারির সময় হলে মিজান ভাইয়ের মাদরাসায় চলে আসি, এখানে সকলের সাথে বসে বিনামূল্যে ইফতার করি।’
স্থানীয় এক বাসিন্দা শামীম হোসেন বলেন,’আমি অসুস্থ। আয় রোজগার করতে পারি না। আমার পরিবারের ৩ সদস্য। আমরা সবকয়টি রোজা রেখেছি এ পর্যন্ত। তবে আমাদের ইফতার করার মতো সামার্থ নেই। এজন্য সেহরি ও ইফতার প্রতিদিন এ মিজান ভাইয়ের এখানেই করে থাকি।’
জসিম উদ্দিন নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষক বলেন, ‘এতিম শিশুসহ নানা শ্রেনী পেশার মানুষের সাথে একসাথে বসে ইফতার করার মধ্যে এক অন্যরকম মানসিক শান্তি। আর এমন মাসব্যাপী ইফতার আয়োজনের উদ্যোগ অনেক অনেক প্রশংসার যোগ্য। এই আয়োজন সবার জন্য উন্মুক্ত। যে কেউ এসে এখানে ইফতার করতে পারবে।’
মিজানুর রহমানের এই উদ্যোগ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য নয় বরং এটি একটি জীবনবোধের উদাহরণ। যখন মানুষ একে অপরকে সহায়তা করে, তখন সমাজ সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মিজানুর রহমানের এই অসাধারণ উদ্যোগ আমাদের সকলকে স্মরণ করিয়ে দেয়, রমজান শুধুমাত্র উপবাস বা রোজা রাখার মাস নয়, এটি সবার মধ্যে মানবিকতার শক্তি বাড়ানোরও মাস। তার এই ভালোবাসার উদাহরণ, আমাদের সকলের জন্য এক বিশাল প্রেরণা।
এম,এস
আপনার মতামত লিখুন :